অধ্যায় ১: আমি মরে গিয়েছিলাম, আবার বেঁচে উঠলাম

আমি সত্যিই অসীমবার পুনর্জীবিত হতে পারি। খারাপ চালের বুড়ো 3789শব্দ 2026-03-19 04:30:24

        **ওয়েনমিং নামের পর্যটন মহাকাশযানটি সৌরজগতের বাইরে উড়ে গিয়ে এক রহস্যময় প্রতিবন্ধকে ধাক্কা মেরে বিস্ফোরিত হয়। জাহাজের আরোহী ও ক্রু মিলে ২০২৫ জন সবাই মারা যায়।**

না, একজন বেঁচে আছে—সে হল বিশ বছর বয়সী তরুণ পর্যটক, ঝাং শুন।

ঝাং শুন জানেন না কী ঘটেছে। তার মনে পড়ে, তখন সে সবে গোসল সেরে ঘুমাতে যাবে, হঠাৎ জাহাজে একটা ধাক্কা লাগে। সে বুঝে ওঠার আগেই মাথা ঘুরে অজ্ঞান হয়ে যায়।

জ্ঞান ফিরলে দেখতে পায় সে ভূপৃষ্ঠে এসেছে। এক ঘন নয় এমন অরণ্যে। গায়ের পোশাক মহাকাশযানের সময়কার মতোই—কিছুই বদলায়নি।

মানসিকভাবে শক্তিশালী মানুষ হিসেবে এমন অদ্ভুত ঘটনার মুখেও ঝাং শুন খুব স্থির। ঘাবড়ায়নি।

প্রথমে শরীরে কোনো অস্বাভাবিকতা আছে কিনা দেখল। ভালো, সুস্থ।

তারপর চারপাশে তাকাল। মনে রাখার মতো কোনো পরিবেশ বা বস্তু খুঁজতে চাইল—নিশ্চিত হতে চাইল সে কি আগে দেখা কোনো গ্রহে আছে কিনা।

তারপর ঝাং শুন নিশ্চিত হলো, সে আগে দেখা কোনো গ্রহে নেই। কারণ, এক নীল বাঘ তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। কোত্থেকে এল, জানা নেই।

হ্যাঁ, ঝাং শুনের সামনে দাঁড়ানো এক নীল বাঘ। সে কোনো গ্রহে এমন বাঘ দেখেনি। তাই নিশ্চিত, এটা তার পরিচিত কোনো গ্রহ নয়।

দেখতে অনেকটা সাবার-দাঁতওয়ালা বাঘের মতো। দুটো ধারালো দাঁত বেরিয়ে আছে। গায়ের রং নীল, সূর্যের আলোয় ঝলমল করে। আকার প্রায় পৃথিবীর মহিষের সমান। নীল চোখ দুটো যেন ঘণ্টার মতো, তাতে শীতল আভা। চার পায়ের নখ ভার সামলাতে মাটিতে গেঁথে গেছে।

**"উহ্..."**

ঝাং শুন কষ্ট করে লালা গিলল। তার দিকে তাকিয়ে থাকা নীল বাঘটির দিকে চোখ রেখে—যার মুখ দিয়ে লালা পড়ছে।

ভয় না পাওয়ার কথা বলাই মিথ্যে। বাঘটা স্পষ্ট তাকে শিকার মনে করছে। তার চোখের দৃষ্টি থেকে বোঝা যায়—অতিরিক্ত ক্ষুধার্ত মানুষ খাবার দেখলে যেমন করে।

**"ভাই বাঘ, আমি—"**

**"হুউউ!"**

ঝাং শুন কিছু বলতে যাবে, মাত্র তিনটি শব্দ বলেছে। বাঘ তাকে আর কথা বলার সুযোগ দিল না। গর্জন করে মুখ হাঁ করে তার দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ল। এক কামড়ে তার মাথা কামড়ে নিল। সন্তুষ্টিতে চিবুতে লাগল—মানুষের মাংস, কড়কড়ে।

ঝাং শুন মারা গেল। বয়স বিশ।

---

পাঁচ মিনিট পর, বাঘ ঝাং শুনের গোটা শরীর খেয়ে ফেলল। শুধু হাড়ের স্তূপ পড়ে রইল।

বাঘের খাওয়ার গতি বেশ দ্রুত। আর খুব পরিষ্কার—দেখো, হাড়গুলো নির্মল, ফাটল নেই। মাটিতে রক্তের দাগ নেই।

**"ঢ্যাঁক..."**

বাঘ ঢেঁকুর তুলে আনন্দের পায়ে ঘুরে বাড়ি ফিরতে চাইল—মায়ের কাছে।

কিন্তু ঘুরতেই তার দেহ থমকে গেল। মুখে হতভম্ব ভাব।

কারণ, তার সামনে আবার একজন মানুষ হাজির! এই মানুষটি অসাধারণ সুদর্শন। গায়ে সাদা পায়জামা, পায়ে সাপের মতো ফ্লিপ-ফ্লপ।

বলে রাখা ভালো, এই লম্বা, সুঠাম, সুদর্শন, কাঁধ পর্যন্ত চুলওয়ালা মানুষটি ঝাং শুন নিজেই।

এবার শুধু বাঘ নয়, ঝাং শুনও হতভম্ব।

বাঘ যখন তার মাথা কামড়ে নিয়েছিল, প্রথমে প্রায় এক সেকেন্ড ব্যথা অনুভব করেছিল। তারপর জ্ঞান হারিয়েছিল। আবার জ্ঞান ফিরলে বাঘের সঙ্গে চোখাচোখি।

**"আমার কি পুনর্জন্ম হয়েছে? না বিভ্রম?"** ঝাং শুন সামলে নিজের শরীর দেখল। আগের মতোই—কিছু বদলায়নি। স্বপ্ন দেখছে কিনা সন্দেহ হচ্ছে।

**"হুউউ!"**

কিন্তু বাঘ ঝাং শুনকে ভাবার সময় দিল না। তার মনে, সব প্রাণী সুস্বাদু খাবার। বেশি ভাবতে হবে না, শুধু খেয়ে ফেলতে হবে।

ফলে ঝাং শুন আবার বাঘের মুখে পড়ল। এক কামড়ে মাথা গেল। আবার মানুষ-মাংস কড়কড়ে।

---

আরও পাঁচ মিনিট পর। আগের হাড়ের স্তূপের সঙ্গে আরও এক স্তূপ হাড় যোগ হলো।

বাঘ আবার বাড়ি ফিরতে চাইল। ভাবল, মাকে বলবে—আজ দুটো দুই পায়ের জীব খেয়েছে।

ঘুরতেই আবার একজন মানুষ দেখল।

কী পরিচিত দৃশ্য! কী পরিচিত মানুষ! যেন সময় বারবার ঘুরছে।

ঝাং শুন বুঝল, এটা সময়ের পুনরাবৃত্তি নয়। সে সত্যিই পুনর্জন্ম পাচ্ছে।

পুরোপুরি নিশ্চিত নয়। তার মনে একটা বড় ধারণা এসেছে—আরও কয়েকবার মরে দেখবে। মাত্র এক সেকেন্ডের ব্যথা।

যদি সত্যি সত্যি বারবার বাঁচে, তাহলে তো জয়। আর না বাঁচলে—মরতে তো আর ভয় নেই। এর আগেও মরেছে।

তখন অরণ্যে অদ্ভুত দৃশ্য দেখা গেল। মানুষ ও বাঘ—একই কাজ বারবার করছে। আশপাশে হাড়ের স্তূপ পাহাড়ের মতো জমতে লাগল।

বাঘের বুদ্ধি পাঁচের নিচে। তার মনে আছে মা বলেছিল—পেলে খেয়ে ফেলো, নষ্ট করো না। বাড়ি নিয়ে গিয়ে অন্যকে দিও না। তাই এখন বাঘের পেট গোল হয়ে গেছে—গর্ভবতীর মতো। দাঁড়াতেও কষ্ট।

বারবার ঝাং শুনকে সামনে পেয়ে বাঘ আর খেতে পারছে না। সামনে দাঁড়িয়ে তার লাফালাফি দেখছে।

---

**"উহা হা হা... আমি, ঝাং শুন, অমর! উয়াহা হা হা!"**

বেশ কয়েকবার পরীক্ষা করে ঝাং শুন নিশ্চিত হলো—সে সত্যিই বারবার বাঁচে। আনন্দে ফেটে পড়ল।

---

**"হেহে! তাহলে..."** ঝাং শুন দুষ্টু দৃষ্টিতে টলমলে বাঘটির দিকে তাকাল।

**"ভাই বাঘ, উপকারের বিনিময়ে উপকার—এ নীতি তো জানো? তুমি আমাকে এতবার খেয়েছ, এবার আমার পালা!"**

বলে ঝাং শুন বাহু-মোটা এক শুকনো লাঠি হাতে নিল। এক লাফ দিয়ে বাঘের মাথায় আঘাত করল। সাধারণ মানুষ হলে এ সময় দৌড়াত, লড়াই করত না। কিন্তু ঝাং শুন আলাদা। সে সত্যি মরে না। বাঘ মারতে পারলে ভালো খাবার। না পারলেও কিছু হারায় না।

**"ধাম!"**

**"চটাক!"**

মাথা ফাটার বদলে লাঠি দুই টুকরো হয়ে গেল। আর বাঘের দৃষ্টি আরও ভয়ংকর।

**"আরে! বাঘের মাথা এত শক্ত কেন? অসম্ভব! আমি দুর্বল নাকি বাঘের মাথা শক্ত!"** ঝাং শুন হতভম্ব। এত মোটা লাঠির আঘাতে মোটা শুয়োরও ঘুরে যায়। এই বাঘের কিছু হয়নি!

**"হুউউ! হুউউ!"**

নীল বাঘের জাত অসম্মান সহ্য করতে পারে না। ঝাং শুন ভাবার সময় না দিয়ে বাঘ গর্জে উঠল। সবশক্তি দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে ঝাং শুনকে কামড়ে মারল।

**"আমার জীবন কঠিন!"**

---

দশ মিনিট পর। পাশের ঝোপের আড়ালে ঝাং শুন অপ্রস্তুত মুখে দাঁড়িয়ে।

তার আছে অমরত্ব, কিন্তু শক্তি নেই। একটা বাঘ মারতে পারে না। বরং কয়েক দশবার মরেছে—খাবার জোগান দিয়েছে। বলো, কত অপ্রস্তুত লাগে?

**"হায়, থামি। যার কাছে হারি, তার কাছ থেকে পালানো যায়। আমি আর এখানে সময় নষ্ট করব না। বিদায়!"**

যে বাঘ তখনো তার আগের শরীর খাচ্ছে, তার দিকে তাকিয়ে ঝাং শুন দীর্ঘশ্বাস ফেলে দূরের পথে হাঁটা দিল।

জানে, মারতে পারবে না। তাই লড়াই করে সময় নষ্ট না করে বরং অন্য মানুষ খুঁজবে।

---

প্রায় আধা ঘণ্টা পর...

**"এ কোন জায়গা? মানুষের দেখা নেই। এটা আদৌ অরণ্য মনে হচ্ছে না।"**

ঝাং শুন এক পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে দূরের দিকে তাকাল।

আকাশ পরিষ্কার, বাতাস সতেজ, মৃদু বাতাস। দৃষ্টি অনেক দূর পর্যন্ত যায়। দূরে বিস্তীর্ণ সমভূমি, পেছনে পর্বতমালা। এই চূড়াটি যেন প্রাকৃতিক সীমারেখা—দুটি জগতকে আলাদা করে রেখেছে।

**"আজ ভালো দিন! লা লা লা লা লা... হেহে... বাজাখেই..."**

হঠাৎ নিচ থেকে এক সুরেলা গানের আওয়াজ ভেসে এল। সুর ঠিক নেই, কখনো ভাঙাও।

এত হঠাৎ, এত অসহ্য—কোনো পূর্বাভাস নেই, কোনো প্রস্তুতি নেই। ঝাং শুন প্রায় মাটিতে পড়ে গেল।

ভালো কথা, অবশেষে জীবিত মানুষ পেল।

চূড়াটা খুব উঁচু নয়—আনুমানিক দুই-তিন-চার দশ মিটার। ঝাং শুন নিচের মানুষটিকে স্পষ্ট দেখতে পেল।

এক প্রাচীন পোশাক পরা পুরুষ। কণ্ঠ ও গড়ন দেখে মনে হচ্ছে যুবক।

সাদা পোশাক, হাতে ভাঁজ করা পাখা।边走边唱边摇扇子边点头—যেন মাদক সেবন করেছে।

এমন পোশাক দেখে ঝাং শুন মনে করল না এটা সিনেমার শুটিং। তার দৃষ্টি যতদূর যায়, শুধু এই যুবক—কোনো শুটিং দল নেই।

তবে নিশ্চিত নয় এটা উচ্চ প্রযুক্তির গ্রহ নয়। প্রতিটি গ্রহ আলাদা। কোনো গ্রহে প্রযুক্তি উন্নত, কিন্তু পোশাক পৃথিবীর প্রাচীনকালের মতো। আবার কোথাও অস্ত্র পুরনো, পোশাক আধুনিক।

ভাবলে লাভ নেই। সরাসরি জিজ্ঞেস করাই ভালো। আশ্চর্যের ব্যাপার, ঝাং শুন যুবকের গানের ভাষা বুঝতে পারছে। এটা ম্যান্ডারিন না, ইংরেজিও না। কিন্তু বুঝতে পারছে। নিজেও বলতে পারছে বলে মনে হয়। কী কারণে, জানা নেই। সম্ভবত কোনো রহস্যময় শক্তি। যেমন সে নিজেও বারবার বাঁচে।

---

**"এই, ভাই!"**

ঝাং শুন নিচের দিকে তাকিয়ে যুবককে ডাকল। যুবক গাইতে গাইতে মেতে আছে।

মনে হচ্ছে সত্যি মেতে আছে। ঝাং শুনের ডাক শুনতে পেল না। নিজের গানে মন দিয়ে গাইছে।

**"ওহ, মানুষটা আসলেই প্রতিভাবান। গানে এত মন দিতে পারে! কাল্পনিক সাধনার জগতে নিয়ে গেলে এক সেকেন্ডে ধ্যানে বসতে পারবে।"** ঝাং শুন মনে মনে ভাবল—তার ডাক যথেষ্ট জোরে। দুই-তিন-চার দশ মিটার দূরত্বে থাকা মানুষ শুনতে পায়নি মানেই সে গানে এতটাই ডুবে আছে।

**"ভাই! নিচের সেই ভাই—যার কণ্ঠ অসাধারণ, গান অসাধারণ—আমার কথা শুনতে পাচ্ছ?"**

ঝাং শুন সবশক্তি দিয়ে চিৎকার করল। এবার যুবক শুনতে পেল। গান থামিয়ে মাথা তুলল। চোখ সরু করে হাত দিয়ে সূর্যের আলো আটকালো। ঝাং শুনের দিকে তাকাল।

**"ওহ, একই শিল্পী ভাই। আপনিও আমার কণ্ঠ ভালো বলছেন? আমিও তাই মনে করি।**

**আপনি ওপরে কেন? নিচে আসুন। আমরা একসঙ্গে সুর-ছন্দ নিয়ে আলোচনা করি। আমি আমাদের গ্রামের সেরা গায়ক।"**

যুবকের কাছে পাহাড়ের ওপরে মানুষ দেখাটা অস্বাভাবিক মনে হলো না। একবারেই আলোচনায় চলে গেল—সে গান নিয়ে মেতে আছে।

**"ঠিক আছে। কিন্তু কোথায় নামার পথ আছে দেখিয়ে দাও। নিচের দৃশ্য এখান থেকে দেখা যাচ্ছে না।"** ঝাং শুন আলোচনায় মাথা ঘামাতে চায় না। শুধু নিচে নামতে চায়।

**"আচ্ছা, আমি দেখছি।"** যুবক পাহাড়ের চারপাশে চোখ বুলাল। এক ফলাফল বের করল।

**"ভাই, এদিকের সব পাহাড় খাড়া। চলো এগিয়ে গিয়ে দেখি?"**

**"চলো।"** বাধ্য হয়ে ঝাং শুন রাজি হল। সোজা লাফ দিয়ে নামতে পারত। কিন্তু অন্যের সামনে মরে আবার বাঁচা সুবিধার নয়। যদি লাফ দিয়ে মরেই না যায়—তাহলে আরও খারাপ। শুধু ব্যথা পাবে, পঙ্গু হবে।

অদ্ভুত ব্যাপার, মনে হচ্ছিল স্থপতি ইচ্ছাকৃতভাবে এভাবে তৈরি করেছে। তারা অনেকদূর হাঁটল—সব জায়গার ভূপ্রকৃতি একই রকম। এক পাশে সমভূমি, অন্য পাশে পাহাড়। সীমানা সব খাড়া আর মসৃণ।