তৃতীয় অধ্যায় চব্বিশ ঘণ্টার পর্যবেক্ষণ → কাযানোকা উশিহা
জেনে রাখা দরকার, জনপ্রিয় লেখকের সম্পাদকদের কাজ অনেকটা সংস্কৃতি-ব্যবস্থাপকের মতো। তাদের জানতে হয় সংস্কৃতিভিত্তিক ভোগবিলাসের প্রবণতা, তার স্তর ও মানুষের মনস্তত্ত্ব। তবে তার আগে সবচেয়ে জরুরি বিষয়টি হচ্ছে লেখকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
নিজেকে এক বিকৃত মনোভাবাপন্ন ব্যক্তির নজরে পড়া বলে দাবি করা কাসানোওকা শিহার এখন সবচেয়ে বেশি দরকার সুরক্ষা। তার সম্পাদক হিসেবে গো তাকেশি এই বিষয়টি ভালোভাবেই জানেন।
তবে সত্যি বলতে কী, বিকৃত মানসিকতার মানুষদের মোকাবিলার কোনো পদ্ধতি গো তাকেশির জানা নেই, কারণ কখনও তাকে এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়নি।
একজন সৎ ও অবিবাহিত ব্যক্তি হিসেবে, যদি কোনো মানসিকভাবে অস্থির সুন্দরী মেয়ে তার পিছু নেয়, তবে সে তো উল্টো খুশিই হতো...
‘‘ওই অদ্ভুত দৃষ্টির কারণে লেখায় মন বসাতে পারছি না। ‘প্রেমের তালবেতাল’–এর নতুন খণ্ড এখনও শুরুতেই আটকে আছে, ভীষণ যন্ত্রণা লাগছে।’’
‘‘এটা সত্যিই গুরুতর সমস্যা। কাসানোওকা-সেনসেই, আপনি একজন নতুন লেখক হিসেবে, নিয়মিত নতুন বই না ছাড়লে, আপনার জনপ্রিয়তা কমে যেতে পারে।’’
গো তাকেশি অ্যানিমে দেখতে ভালোবাসেন, পাশাপাশি প্রচুর উপন্যাস আর কমিকও পড়েন।
তবে মাঝে মাঝে দেখা যায়, কোনো কোনো লেখক নানা কারণে লেখা বন্ধ করে দেন, কিংবা সিরিজ বন্ধ থাকে, যেমন ধরুন কেউ হয়তো মাহজং খেলতে গেছেন—কতই ভালো হোক না কেন সেই রচনা, ধীরে ধীরে পাঠকের আগ্রহ কমতেই থাকে।
এমনকি প্রতিষ্ঠিত লেখকদেরও যখন এমন হয়, তখন সদ্য ‘প্রেমের তালবেতাল’ দিয়ে আত্মপ্রকাশ করা কাসানোওকা শিহার কথা তো বাদই দিন।
‘‘যখনই একটু শান্ত হয়ে বসি, মনে হয় কেউ আশপাশে আছে। সময়টা সাধারণত সকাল আট-ন’টা থেকে রাত দশটা।’’
‘‘মানে ছুটির সময়ই ওই বিকৃত ব্যক্তি নজর রাখে?’’
‘‘অবশ্যই, গো তাকেশি, আপনি কি মনে করেন আমি স্কুলে বসে লিখতে পারবো? ওটা একেবারেই অসম্ভব! অথচ বাড়িতে থাকলেও এই সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।’’
‘‘দেখা যাচ্ছে, ওই অনুসরণকারী বিকৃত ব্যক্তিরও নিয়মিত রুটিন আছে। কাসানোওকা-সেনসেইয়ের আশেপাশের লোকজনদের ভালোভাবে খতিয়ে দেখতে হবে।’’
কাসানোওকা মাথা নেড়ে গো তাকেশির দিকে তাকালেন, মৃদুস্বরে বললেন—
‘‘প্রথমে সন্দেহ করবেন কাকে? গো তাকেশি, আপনি তো প্রতিদিন আমাকে গোপনে দেখছেন না তো?’’
‘‘হা-হা, বেশ মজার কথা বললেন! যদি আমি সত্যিই আপনাকে গোপনে দেখতাম, এত বোকা হতাম না যে ধরা পড়ে যেতাম!’’
আমার ‘লেজ-লাগা’ খেলার অভিজ্ঞতা কিন্তু এমনিতে যায়নি!—গো তাকেশি মনে মনে জোর দিয়ে বলল।
‘‘ওরকম আত্মবিশ্বাস একটু অদ্ভুতই লাগে। তবে গো তাকেশি, আপনি যদি সত্যিই সমস্যাটা সমাধান করতে পারেন, আমি একটা অনুরোধ মানতে রাজি।’’
‘‘কোনো বাড়তি সুবিধা লাগবে না, এটাই তো আমার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব।’’
‘‘না, সাধারণত সম্পাদকরা তো পুলিশ ডাকার পরামর্শ দেন। এমন উষ্ণ হৃদয়ের সম্পাদক, গো তাকেশি, আপনি-ই প্রথম।’’
দেখা গেল, কাসানোওকার মন বেশ ভালো হয়ে গেছে, হাসিমুখে গো তাকেশির দিকে তাকিয়ে আছেন।
গলা খাঁকারি দিয়ে নিজেকে শান্ত করল গো তাকেশি, মুখে আনলেন গম্ভীর ভাব।
‘‘কাসানোওকা-সেনসেইর নতুন বইয়ের জন্য আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো। কারণ, আমিও আপনার ভক্ত।’’
‘‘বেশ অবাক হলাম, ধন্যবাদ।’’
কাসানোওকা গো তাকেশির হাত ধরে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেন, তারপর স্বাভাবিক মুখে জিজ্ঞেস করলেন—
‘‘এই কথাগুলো কোন খণ্ড থেকে নেওয়া?’’
‘‘...’’
‘‘কিছু সমস্যা আছে?’’
‘‘ক্ষমা চাইছি, আসলে সম্পর্কটা ভালো করতে এমন কথা বলেছি।’’
অপ্রস্তুত মুখে গো তাকেশি বলল, একটু পরে সে ‘প্রেমের তালবেতাল’ কিনে পড়বে।
তাকে প্রতারিত করা সত্ত্বেও কাসানোওকা রাগ করলেন না, বরং বুকের সামনে হাত গুটিয়ে গো তাকেশির দিকে নিচ থেকে তাকালেন—যদিও উচ্চতায় গো তাকেশির চেয়ে ছোট।
‘‘সমস্যা নেই, আমি সরল মানুষের ওপর রাগ করি না। কারণ, আমার আশেপাশেও এমন এক বোকা আছে। তবে দ্বিতীয়বার আর প্রতারণা চলবে না।’’
‘‘ঠিক আছে, আশা করি আমরা ভালোভাবে কাজ করতে পারবো, কাসানোওকা-সেনসেইর বই হিট করুক!’’
‘‘তোমার সমর্থনের জন্য ধন্যবাদ!’’
দু'জনে সভাকক্ষে হাত মেলালো, তাদের সহযোগিতা আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হলো। মেয়েটির হাত কল্পনার চেয়েও নরম, গো তাকেশি এমন মেয়েদের একেবারেই অপছন্দ করেন না—বরং, এমন মেয়েরা সবার মধ্যেই সুরক্ষার ইচ্ছা জাগিয়ে তোলে, তাই তো?
——
কাসানোওকার বিকালে ক্লাস ছিল, তাই তিনি অমরকাওয়া বইঘর ছেড়ে চলে গেলেন।
কালই ছুটি, গো তাকেশি ভাবলেন, আগামীকালের প্রস্তুতি এখনই নিতে হবে।
এই মুহূর্তে তিনি অমরকাওয়া বইঘরে থেকে একটু ঘুরে দেখার সিদ্ধান্ত নিলেন, জানতে চাইলেন জাপানের প্রকাশনা সংস্থাগুলো কীভাবে চলে।
একসময় ‘স্বপ্নখাদক’ পড়ার পর থেকেই গো তাকেশি ভেবেছিলেন, একদিন না একদিন আমিও এই উত্তেজনায় ডুব দেবো।
দেখা যাক, এই জগতে কী ধরনের সৃষ্টি বিদ্যমান। কোনো বিখ্যাত সৃষ্টি না থাকলে, গো তাকেশি ঠিক করেছেন, নিজেই তা এখানে প্রতিষ্ঠা করবেন! নিজের হাতে এই ভিনদেশে নতুন ঐতিহ্য গড়ে তুলবেন!
‘‘আহ, দাঁড়াও, দাঁড়াও, তাকেশি-кун!’’
‘‘তাকেশি-кун?’’
‘‘তোমাকেই বলছি, বোকার মতো দাঁড়িয়ে আছো কেন।’’
সম্পাদনা বিভাগে গো তাকেশিকে ডেকে দাঁড় করালো এক রীতিমতো দক্ষ, ছোট চুলের, ফর্মাল পোশাকে এক নারী; তিনি একেবারে প্রাণবন্ত ও সতেজ।
‘‘সাম্প্রতিক কাজের চাপের জন্যই কাসানোওকা-সেনসেইকে তোমার হাতে দিয়েছি, সমস্যা তো নেই?’’
‘‘হ্যাঁ? আহ, নিশ্চিন্ত থাকুন, মাচিদা-সান, কোনো সমস্যা নেই!’’
এবার বুঝতে পারল গো তাকেশি, তাকেশি-кун বলতে তাকেই ডাকা হচ্ছে। আর যিনি ডেকেছেন, তিনি হলেন কাসানোওকার সাবেক সম্পাদক, নাম মাচিদা সোনো।
‘‘এতটা বোকা হলে চলবে না, জুনিয়র হিসেবে তোমাকে সম্পূর্ণ মনোযোগ দিতে হবে!’’
পিঠে জোরে চাপড় মারলেন মাচিদা, গো তাকেশি পড়ে যেতে যেতে সামলে নিলেন। বোঝা গেল, একজন এজেন্ট হিসেবে তিনি এখনও খুব দুর্বল, শক্তি বাড়াতেই হবে!
তবে নিজেকে শক্তিশালী করতে হলে আগে প্রয়োজন, নিজের আওতাধীন লেখকের কিছু সাফল্য ও অর্জন থাকা। নইলে কোনো পয়েন্ট পাওয়া যায় না।
এ মুহূর্তে গো তাকেশির অবস্থা—
[এজেন্টের স্তর: লেভেল ১
বুদ্ধিমত্তা: ২৩
শারীরিক শক্তি: ২৩
বল: ২৩
দক্ষতা: কিছু নেই।
অর্জিত পয়েন্ট: ১০০০, গতকাল ব্যয় হয়েছে ২০০০;
বর্তমান লক্ষ্য: কাসানোওকা শিহাকে বিখ্যাত বানানো।]
উল্লেখ্য, সাধারণ মানুষের সব গুণের মান ২০-এর আশেপাশে, গো তাকেশি শুধু সামান্য এগিয়ে আছেন।
গো তাকেশির প্রতিক্রিয়ার তোয়াক্কা না করে, মাচিদা কোলজুড়ে নানা কাগজ ও পান্ডুলিপি নিয়ে ঘুরে তাকালেন।
‘‘কিছু আগে দেখলাম, কাসানোওকা-সেনসেই তাড়াহুড়ো করে ফিরে গেলেন। তাহলে সমস্যা কি মিটে গেছে?’’
‘‘না, মাচিদা-সান, চিন্তা করবেন না, সমস্যা এখনো চলছে। তবে আমি শিগগিরই সমাধান করবো।’’
‘‘খুব ভরসাযোগ্য লাগছে, জুনিয়র!’’
উৎসাহী নারী সম্পাদক গো তাকেশির কাছে একটু কঠিন ধরনের, তবে এই মুহূর্তে হাসতে হবে!
উত্তম এজেন্ট হতে চাইলে, যেকোনো পরিস্থিতিতে প্রস্তুত থাকতে হয়।
‘‘বলো তো, কী করছো তুমি?’’
‘‘এটা গোপন রাখতেই হবে।’’
কারণ, গো তাকেশি কাউকে বলবেন না, আগামী ছুটির দিনে চব্বিশ ঘণ্টা কাসানোওকা শিহার ওপর নজর রাখার পরিকল্পনা করেছেন।
‘‘ওহো, তাহলে চেষ্টার কোনো কমতি রেখো না। আমি তোমার সাফল্যের অপেক্ষায় রইলাম!’’
‘‘ধন্যবাদ, মাচিদা-সেনপাই।’’
তাহলে, চল এবার নজরদারির সরঞ্জাম প্রস্তুত করি!