অধ্যায় ১: ২২ আগস্ট
**"ঠক্ ঠক্..."**
হাতে থাকা কলম থামালাম। কিছুক্ষণ স্থির হয়ে শুনলাম। আবার কলম তুলে পড়া চালিয়ে গেলাম।
**"ঠক্ ঠক্..."**
আবার সন্দেহে কলম থামালাম। কান খাড়া করে ভালো করে শুনলাম।
**"ঠক্... ঠক্"**
**"বাবা?"** অবশেষে ধৈর্য হারালাম। ঘুরে দরজার দিকে তাকিয়ে ডাকলাম, **"বাবা, আপনি?"**
আমার গলা দরজায় ধাক্কা খেয়ে ফিরে এল। বাইরে নিস্তব্ধ। কোনো সাড়াশব্দ নেই। বাধ্য হয়ে আবার কলম তুলে পড়তে লাগলাম।
**"হুহু..."** হালকা নিঃশ্বাসের শব্দ। সঙ্গে হালকা পায়ের শব্দ কাছে আসছে।
**"বাবা?"** এবার একটু ভয় পেতে শুরু করলাম। আমি আর মা-বাবা আলাদা ঘরে থাকি—৪০৪ ও ৪০৩ নম্বরে। লোহার দরজা দিয়ে দুটি এক বেডরুমের ঘর এক ইউনিটে বাঁধা। সাধারণত বাবা ৪০৩ থেকে চুপিচুপি এসে দেখেন আমি পড়ছি কিনা। তার পায়ের শব্দ হালকা, নিঃশ্বাসও হালকা। কিন্তু আমার জন্য তা চেনা সহজ। এখন যেমন—শব্দ যেন আছে, যেন নেই; চেনা, অচেনা।
**"বাবা?"** একবার ডাকলাম। কোনো উত্তর নেই।
কলম নামালাম। টেবিল সামনে ঠেলে দাঁড়িয়ে দরজার কাছে এলাম। গভীর নিঃশ্বাস নিলাম। **"চি..."** এক হাতে দরজা খুলে অন্যহাতে দরজার ফ্রেম ধরে বাইরে তাকালাম। বসার ঘর নিস্তব্ধ। কেউ নেই। মূল দরজাও বন্ধ।
হয়তো বাবা এদিকে এসে নিজের ঘরে চলে গেছেন। নিজেকে সান্ত্বনা দিলাম।
**"হুহু——"**
**"ঠক্—ঠক্——"**
সবে দরজা বন্ধ করেছি, আবার এই শব্দ শুনে জায়গায় জমে গেলাম।
যা হবে হবে। সাহস করে ঘুরে দরজা পুরো খুলে দেয়ালের সঙ্গে ঠেসে দিলাম—যাতে নিজে থেকে বন্ধ না হয়।
ধীরে ধীরে বেরিয়ে পড়লাম। বসার ঘরের সুইচ দরজার কাছে। ঘরে ঢুকলেই আলো জ্বালাতে হবে।
বসার ঘর ভয়ংকর অন্ধকার। মনে মনে গালাগালি করতে লাগলাম। ভয়ে সত্যিই কাঠ হয়ে যাচ্ছি। ভালো, বেডরুমের আলো বসার ঘরের এক-চতুর্থাংশ আলোকিত করেছে। কিন্তু প্রতিটি পা অন্ধকারের আরও কাছে নিয়ে যাচ্ছে।
দরজার কাছে পৌঁছাতে পা অবশ হয়ে আসছে। কষ্টে পৌঁছে দ্রুত বসার ঘরের আলো জ্বালালাম। হালকা স্বস্তি পেলাম। চুপিচুপি মূল দরজা খুললাম। দুই ঘরের সংযোগকারী করিডোর পেরিয়ে জানালা দিয়ে ভেতরে তাকালাম। মা-বাবার ঘরের দরজা খোলা। ভেতরে অন্ধকার। তারা ঘুমিয়ে পড়েছে মনে হচ্ছে।
পিঠের হাড় শিউরে উঠল। শরীর কেঁপে উঠল। বেশি না ভেবে দ্রুত নিজের ঘরে ফিরে এলাম। দরজা বন্ধ, আলো বন্ধ। শত মিটারের গতিতে নিজের ঘরে ঢুকে জোরে দরজা বন্ধ করলাম।
দরজায় পিঠ ঠেকিয়ে নিঃশ্বাস ফেলারও সাহস পেলাম না। বিছানায় ঢুকে গেলাম।
**"হুহু—— হুহু——"**
আবার সেই শব্দ। ভয়ে কাঁদতে ইচ্ছে করলেও কান্না এল না। মাথা বের করতে সাহস পেলাম না। মনে মনে প্রার্থনা করতে লাগলাম—মেরি থেকে বুদ্ধ পর্যন্ত সবাইকে ডাকলাম। ভয়ে কথা জড়িয়ে আসছিল।
অনেকক্ষণ পর ধীরে ধীরে শান্ত হলাম। সাবধানে মাথা ঢাকা চাদর খুলে চারপাশে তাকালাম।
**"আআআ——!!!"** পাগলের মতো চিৎকার করে হাত-পা ছুঁড়তে লাগলাম।
**"জিয়াজিয়া। ওঠো! জিয়াজিয়া?"**
মায়ের কণ্ঠ শুনতে পেলাম।
**"জিয়াজিয়া? জিয়াজিয়া, কী হয়েছে?"** সত্যিই মায়ের কণ্ঠ। **"কী হয়েছে? ওঠো। খারাপ স্বপ্ন দেখেছিস?"**
সত্যিই মায়ের কণ্ঠ। ধীরে চোখ খুললাম। দেখলাম পুরো বগির চাচা-চাচীরা মাথা বের করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।
**"এই বাচ্চা, খারাপ স্বপ্ন দেখে চেঁচিয়ে সবাইকে ভয় দেখালি?"** মা অভিনয় করে আমার কপালের ঘাম মুছলেন। **"দেখ, ট্রেনে কী লজ্জা লাগছে না?"**
বগির চাচা-চাচীরা শুনে হেসে উঠলেন।
আমি লজ্জায় মাটিতে গর্ত খুঁড়ে ঢুকতে চাইছিলাম।
**"কুঙ্ ছা—— কুঙ্ ছা——"**
ট্রেনের শব্দ। অবশেষে ওই জায়গা ছেড়ে নতুন জায়গায় যেতে পারছি। খুব খুশি। প্রতিদিন ভয়ে ভয়ে থাকার দিন চিরতরে শেষ হচ্ছে।
**"যাত্রীবন্ধুগণ, আমাদের এই ট্রেনের শেষ স্টেশন—বি নগরী পৌঁছাতে চলেছে। অনুগ্রহ করে নিজ নিজ জিনিসপত্র নিয়ে নামার প্রস্তুতি নিন।"**
গভীর নিঃশ্বাস নিলাম। এটাই আমার জীবনের নতুন শুরু—বি নগরী।
আজ বিশ্ববিদ্যালয়ের নবীন শিক্ষার্থীদের ভর্তির দিন। আজ আমার জন্মদিনও।
টিউশন ফি জমা দিয়ে চাদর, বালতি ইত্যাদি নিয়ে বিভাগে গিয়ে জানলাম, আমার রুম নম্বর ৪০৪। সত্যি বলতে, এই সংখ্যাটা খুব পছন্দ না। কারণ আমাদের বাড়ির নম্বরও ৪০৪।
মা-কে নিয়ে নিজের বিছানা গুছিয়ে ফেললাম। পরে মা জন্মদিন উদযাপন করার সিদ্ধান্ত নিলেন—জীবনে প্রথমবার নিজের শহরের বাইরে জন্মদিন। বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে একটি রেস্তোরাঁয় কয়েকটি পদ অর্ডার করলাম। বি নগরীর খাবারের পরিমাণ সত্যিই ভালো। আমার জন্ম নেওয়া দক্ষিণের সি নগরীর মতো নয়—যেখানে খাবার দেখতে সুন্দর, কিন্তু পেট ভরে না।
আজকের পর মা বাড়ি ফিরে যাবেন। এখন থেকে একা এই অচেনা নগরীতে পড়তে হবে। নতুন মানুষ, নতুন অভিজ্ঞতা। সবচেয়ে বড় কথা, শেষ পর্যন্ত পুরনো দুঃস্বপ্ন থেকে মুক্তি। আর প্রতিদিন ভয়ে ভয়ে থাকতে হবে না—আনন্দে বিশ্ববিদ্যালয় জীবন কাটাতে পারব।
**"হ্যালো, আমার নাম ঝেং লিং। তোমার মতোই ওপরের বিছানায় থাকি। এখন থেকে আমরা পাশাপাশি থাকব, ভালো বন্ধু হবে।"** ঝেং লিং দেখতে সুন্দর। যেন মিশু জাতি। আবার যেন আদিবাসী—অনন্য রূপ।
**"আমার নাম লিউ জিয়া। আমাকে জিয়াজিয়া ডাকলেই হবে।"** আমি নিজের ওপরের বিছানায় বসে ঘুরে হেসে উত্তর দিলাম।
**"ঠিক আছে।"** ঝেং লিং-র হাসি বেশ খোলামেলা। **"জিয়াজিয়া, তাহলে আমাকে লিংলিং ডাকবে।"**
হোস্টেল অ্যাপার্টমেন্ট ধাঁচের। তিন বেডরুম, এক বসার ঘর। আমি, ঝেং লিং, উ জিয়াও, জিন জিং ও মা ইয়ান—পাঁচজন দক্ষিণের বড় ঘরে থাকি। ঘরে দক্ষিণমুখী বারান্দা। উত্তর দিকে, জলের ঘরের পাশের তিন-শয্যার ঘরে থাকেন হু শানশান, ইউ শিয়াওমেই ও ছিংহে দিয়ান। দুই-শয্যার ঘরে থাকেন একই এইচ নগরীর লিন নান ও ওয়াং শিয়াওশিয়াও।
**"আমি মা ইয়ান। ১ মার্চ জন্ম। সবার বড় মনে হয়। আমি ও জিন জিং—দুজনে স্থানীয়। ছুটির দিন বাড়ি যাব। তোমরা আমার ডেস্ক ব্যবহার করতে পারো।"** মা ইয়ান ছেলেমানুষের মতো। আবার বড় বোনের মতো।
**"আমি জিন জিং। মা ইয়ানের মতো ছুটির দিন বাড়ি যাব। তোমরা আমার ডেস্ক নিলে কিছু যায় আসে না।"** জিন জিং-র গলা চিকন চিকন। কথা বলার সময় তার বড় চোখ দুটো জ্বলজ্বল করে—হ্যামস্টারের মতো চমৎকার।
**"হুঁ। আমি জিয়াওজিয়াও। না, না, আমার নাম উ জিয়াও। আমাকে জিয়াওজিয়াও ডাকলেই হয়।"** উ জিয়াও লজ্জায় মাথা চুলকালো। **"আমি ৫ বছর বয়সে স্কুলে ভর্তি হয়েছিলাম। ক্লাসে সবচেয়ে ছোট আমি।"**
**"বাহ্। চমৎকার!"** ঘরময় কোলাহল পড়ে গেল।
**"এত ছোটে স্কুলে?"**
**"সত্যিই ভালো। নিজেকে বুড়ো মনে হচ্ছে।"**
**"ঠিক বলেছ। স্নাতক হলেও বয়স বিশ হবে। খুব ইর্ষা লাগে।"**
পাঁচজনে কথায় কথায় রাত গভীর করে ফেললাম। ভালোই হয়েছে। এখনো আনুষ্ঠানিক ক্লাস শুরু হয়নি। সময়মতো লাইট বন্ধের নিয়মও চালু হয়নি। নবীনদের জন্য ভালোই হয়েছে।
বিছানায় শুয়ে সাদা সাদা ছাদ, উজ্জ্বল টিউবলাইট দেখছি। সবার হাসি-ঠাট্টা শুনতে শুনতে ভাবছি—মেয়েদের অপরিচিতদের সঙ্গে দ্রুত ঘনিষ্ঠ হওয়ার ক্ষমতা জন্মগত।
সত্যিই ভালো। মনে মনে হাসলাম: **লাইট জ্বালিয়ে ঘুমানো সত্যিই দারুণ।**