উনিশতম অধ্যায়: অতীত
নদীর ওপরে একটি ছোট সেতু, সেতুটি পেরোলেই রাজপ্রাসাদ আর বেশ দূরে নয়। প্রাসাদে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ল নয়নাভিরাম বাঁকানো বারান্দা, চাতাল আর ছোট ছোট চায়ের ঘর। এই ধরনের ছোট সেতু আর শান্ত জলের ধারঘেরা অনাবিল স্থাপত্যশৈলীটি আশ্চর্যজনকভাবে স্বপ্নচন্দ্র দেশের রাজপ্রাসাদের মতোই মনে হলো।
রাতের আকাশের নীচে প্রথম দর্শনেই এই স্থানটির প্রেমে পড়ে গেল। শরৎ শিকার পর্বত সত্যিই এক চমৎকার স্থান, পাহাড়ে শিকার করা যায়, পাহাড় থেকে একটু দূরে শহরটি বেশ জমজমাট, বিনোদন ও আনন্দের জন্য উপযুক্ত। তার ওপর আছে উষ্ণ প্রস্রবণ, যা এখন রাজপুরীর অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, উষ্ণ প্রস্রবণের চারপাশে অসংখ্য গাছ রোপণ করা হয়েছে।
কাছ থেকে দেখলে বোঝা যায়, ওহ, এগুলোও গাছই, তবে পিচ এবং বরফগাছ একসাথে রোপিত হয়েছে, যেন মিশ্র ছোটো একটি বনভূমি। শোনা যায়, প্রতি বছর খৈয়াম সম্রাট এখানে কিছুদিন কাটান, সঙ্গে নিয়ে আসেন মন্ত্রী, সেনাপতি আর হারেমের রমণীদের। সেনাপতিরা দিনে শিকার করেন, মন্ত্রীরা রাতে কবিতা লিখে প্রতিযোগিতা করেন, রমণীরা নিরুদ্বেগে উষ্ণ প্রস্রবণে স্নান করেন, বাগানে ঘুরে বেড়ান।
জীবন কতটা নিরুদ্বেগ ও প্রশান্ত! রাতের আকাশের নীচে মনে মনে দীর্ঘশ্বাস ফেলল, এরা সত্যিই উপভোগ করতে জানে, শুধুমাত্র আফসোস, এত সুন্দর বাগান এভাবে নষ্ট হচ্ছে। রাতের আকাশের নীচে লক্ষ্য করল প্রাসাদের সাজসজ্জা সদ্য সংস্কার হয়েছে বলে মনে হচ্ছে, আবার মনে হলো খৈয়াম সম্রাট এমন ধারার অনুরাগী নন, তাই মনে সন্দেহ জাগল। একবার খৈয়াম রালীকে দেখে মনে হলো, ঠিক আছে, জিজ্ঞাসা করল, ‘‘এই প্রাসাদ তো খুব নতুন মনে হচ্ছে, বেশিদিন হয়নি তৈরি হয়েছে?’’
‘‘হ্যাঁ, চার বছর তো হবে!’’ খৈয়াম রালী একটু ভেবে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
‘‘ওহ, তাহলে এই রাজপ্রাসাদটি নির্মাণের দায়িত্ব কে নিয়েছিল? আমার তো মনে হয় না, সম্রাট, মানে পিতা, এই ধরনের নকশা পছন্দ করেন?’’ রাতের আকাশের নীচে আবার জানতে চাইল, কৌতূহল, খৈয়াম সম্রাট কীভাবে সম্মতি দিলেন এই প্রাসাদ রেখে যেতে।
এবার খৈয়াম রালী সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না, নত মাথায় চুপচাপ থাকল, অনেকক্ষণ পর এক গভীর শ্বাস নিয়ে মাথা তুলল, ‘‘আমার দাদা গড়েছেন।’’
রাতের আকাশের নীচে এবার অস্বাভাবিক কিছু টের পেল, পাশে থাকা চু ছিয়ু ও লিউ ছিং ছিংও চুপচাপ হয়ে গেল। খৈয়াম রমিন, তেজস্কর দেশের প্রথম রাজপুত্র, খৈয়াম রালীর সহোদর। রানি-মাতার কারণে, খৈয়াম রালী জন্মের পর মাসের উৎসবে সম্রাট খৈয়াম তাকে যুবরাজ হিসাবে ঘোষণা করেন। পরে, বন্যা নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে মহামারীতে আক্রান্ত হন, চিকিৎসার আগেই মারা যান।
পরে সম্রাট খৈয়াম আবার খৈয়াম রাওয়ানকে পাঠান, তিনিই জলবন্যা নিয়ন্ত্রণে আনেন। রাতের আকাশের নীচে ভাবল, খৈয়াম রালীর মুখে বড় দাদা মানেই নিশ্চয় খৈয়াম রমিন। না হলে হঠাৎ এমন ভারী, দমবন্ধ করা পরিবেশ কেন হবে?
খৈয়াম রালী দাদার শোকে কাতর, চু ছিয়ু বন্ধু হিসেবে সব জানে বলে বিষণ্ণ, আর লিউ ছিং ছিং? চতুর্থ রাজপুত্রের প্রাসাদে, রাতের আকাশের নীচে শুনেছিল, তখন যুবরাজ খৈয়াম রালী মহামারীতে মারা গেলে, সংক্রমণ ছড়ানো এড়াতে খৈয়াম রাওয়ান তার দেহ দাহ করে হাড়গোড় নিয়ে রাজধানীতে ফেরেন। একটি দেশের যুবরাজ, মৃত্যুর পর এমনকি দেহটাও রক্ষা পেল না, কতটা হৃদয়বিদারক!
রানি-মাতা সংবাদ শুনে তখনই জ্ঞান হারান, জ্ঞান ফেরার পর দিনরাত কেঁদে অসুস্থ হয়ে পড়েন। যখন চিতাভস্মের বাক্সটি দেখেন, অশ্রু শুকিয়ে গলা ফেটে কান্না করেন, শুনতে শুনতে সবাই বিষণ্ণ হয়ে পড়ে— সত্যিই দেখলে চোখে জল আসে।
যুবরাজের মৃত্যু, গোটা দেশে শোকের ছায়া, রানি অসুস্থ হয়ে পড়েন, সম্রাটও রাজ্যকার্যে ব্যস্ত, পুত্রশোকে ও দায়িত্বে ক্লান্ত হয়ে পড়েন। তাই যুবরাজের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সামলান খৈয়াম রালী। তখনকার খৈয়াম রালী ছিলেন দাদার আদরে বেড়ে ওঠা এক কিশোর রাজপুত্র, নিজে কিছু করার ক্ষমতা ছিল না, কিন্তু দাদার মৃত্যুর পর অনেকটাই পরিণত হন।
যখন যুবরাজ সমাধিস্থ হলেন, সবকিছু শেষ, খৈয়াম রালী সঙ্গে করে নিয়ে এলেন এক তরুণীকে। শোনা যায়, মেয়েটিকে যুবরাজের প্রাসাদ থেকে নিয়ে আসা হয়েছিল, আরও শোনা যায়, ফেরার সময় মেয়ে অত্যন্ত ক্লান্ত, বিমর্ষ ছিল। আরও শোনা যায়, সেই মেয়েটি শোকে কালো পোশাক পরেছিল, তবে সে চাকরের বেশে নয়। মেয়েটিকে খৈয়াম রালী নিয়ে এসে বাগানের লিউ-আঙ্গিনায় রাখেন, তারপর থেকে কয়েকজন চাকর ছাড়া কেউই সেখানে ঢুকে না।
শোনা যায়, এর আগে লিউ-আঙ্গিনা এই নামে পরিচিত ছিল না, আঙ্গিনার উইলো গাছও খৈয়াম রালী মেয়েটির পছন্দে পরে লাগিয়েছিলেন। মেয়েটি কিছুদিন সেখানে থাকার পর আবার মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়ে, খৈয়াম রালী তাকে নিয়ে চিকিৎসার জন্য মাসের পর মাস বাইরে ছিলেন। কেউ জানে না, মেয়েটি কী রোগে আক্রান্ত হয়েছিল, কেন রাজ চিকিৎসকরাও নিরাময় করতে পারেনি।
সবাই জানে, মেয়েটি চিকিৎসা শেষে ফিরে এলে তবেই সবার সামনে আসতে শুরু করে। আরও জানা যায়, চতুর্থ রাজপুত্রের প্রাসাদের প্রতিটি চাকর মেয়েটিকে দেখলে ‘‘লিউ-কুমারী’’ বলে সম্ভাষণ জানাত। রাতের আকাশের নীচে জানে, সেই মেয়েটি হলেন লিউ ছিং ছিং, যার সঙ্গে খৈয়াম রালীর সম্পর্ক অস্বাভাবিক ঘনিষ্ঠ।
রাতের আকাশের নীচে আরও জানে, খৈয়াম রালী বহু কষ্টে কোথা থেকে কিছু রঙিন মাছ নিয়ে এসে লিউ-আঙ্গিনার পুকুরে ছেড়েছিলেন। রাতের আকাশের নীচে মনে পড়ল সেই দিনটার কথা, তখন সে চতুর্থ রাজপুত্রের প্রাসাদে ছিল, তখনও লিউ ছিং ছিং সুস্থ হননি। সে একঘেয়ে হয়ে এদিক-ওদিক ঘুরছিল, রোদটা বেশ ভালো লাগছিল, তাই একটু কৌশলে বাড়ির ছাদে উঠে গেল।
রোদের ঝলকানিতে আরাম লাগছিল, রাতের আকাশের নীচে চোখ বন্ধ করে আধো ঘুমে, তখনই নিচের পায়ের শব্দে জেগে উঠল। এরপর দুইজনের কথোপকথন কানে এল— ‘‘তাওতাও, এই ক’দিন তুমি কোথায় ছিলে?’’
‘‘ওহ, বাসায় কিছু সমস্যা হয়েছিল, আমি আর দিদি গ্রামে গিয়েছিলাম।’’
‘‘সব ঠিকঠাক হয়েছে তো? কোন অসুবিধে হবে না তো?’’
‘‘না, কিছুনা, শ্যাংশ্যাং দিদি, তুমি চিন্তা কোরো না।’’
‘‘তাহলে ঠিক আছে। আচ্ছা, তাওতাও, তোমার দিদি তো রাজপ্রাসাদে চাকরি করতেন, ইচ্ছেমতো বেরোতে পারলেন কী করে?’’
‘‘হ্যাঁ, তিনি আগে রাজপ্রাসাদে চাকরি করতেন, এখন বদলি হয়েছেন। আগে তিনি যুবরাজের প্রাসাদে কাজ করতেন, পরে... তাকে সেনাপতির প্রাসাদে পাঠানো হয়েছে, শ্যাংশ্যাং দিদি, তুমি ভুলে গেছ?’’
‘‘ওহ হ্যাঁ, দেখো আমার স্মৃতি! তোমার বাসায় কিছু হয়নি, কিন্তু চতুর্থ রাজপুত্রের প্রাসাদে বড় ঘটনা ঘটেছে, শোনা যাচ্ছে লিউ-আঙ্গিনার সেই মহিলা ভীষণ অসুস্থ, রাজপুত্র অনেক দিন ধরে পাশে আছেন।’’
‘‘তাহলে রাজপুত্রবধূর কী অবস্থা...’’
‘‘হ্যাঁ, ভাগ্যিস রাজপুত্র উদার মনের মানুষ, না হলে...’’
‘‘শ্যাংশ্যাং দিদি, আমার দিদি বলেছিলেন, লিউ-কুমারী আগে চাকর ছিলেন না, যুবরাজ বাইরে কাজে গেলে নিয়ে আসতেন, তখন লিউ-কুমারী অনেক ছোট ছিলেন, শুনেছি তাকে কন্যার মতোই মানুষ করা হয়েছে।’’
‘‘তিনি আসার পর থেকেই আমার মনে হয়নি, তিনি চাকর।’’
‘‘তবুও শুনেছি, যুবরাজ তাকে খুব ভালোবাসতেন, জানি না কেন এখন চতুর্থ রাজপুত্রের সঙ্গে, শুনেছি যুবরাজ আর তার মধ্যে...’’
দুজনের দূরে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাকিটা আর শোনা গেল না। হয়তো রাতের আকাশের নীচে একটু কৌতূহল দেখালে, পরে এসব ঘটনা ঘটত না, কিন্তু সে চোখ বন্ধ করে আধো ঘুমেই রয়ে গেল।
এখন রাতের আকাশের নীচে মনে করে, লিউ ছিং ছিং ও যুবরাজের মধ্যে গভীর সখ্যতা ছিল, এখন খৈয়াম রালীর সঙ্গে প্রেমে আবদ্ধ হয়ে একত্রিত হয়েছে, সবই নিয়তির খেলা। শুধু আফসোস, মাঝপথে এসে নিজেই যেন বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তাই এখন খৈয়াম রমিনের কথা উঠলে লিউ ছিং ছিংয়ের দুঃখ পাওয়াটা স্বাভাবিক।毕竟, এমন গুরুতর পরিচর্যা ও কৃতজ্ঞতা, অনেক বছরের সহবাসে ভালোবাসার জন্ম না নেওয়া কি সম্ভব?